Return to Home

দীপ্তাগ্নি

বাইদোয়া, সোমালিয়া। রাতের তীব্র ঠাণ্ডা শেষে আবার দিনের কঠোর সূর্য যেন দেহের সব শক্তি শুষে নেওয়ার আয়োজন করেছে। প্রকৃতির এই রুক্ষ ব্যবহারের মাঝে নিরাশ্রয় এক মা আর তার ছেলে একটি বস্তির পাশের আবর্জনায় তাদের জায়গা অধিকার করে নিয়েছে। কোনো রকমে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা। গর্ভে চার মাসের সন্তান, পাকস্থলিতে ক্ষুধার উদগীরণ ঘটলেও এসব নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, রাত পোহালে মনে হয়, রাতটা আরেকটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো। বাচ্চাটা ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে আরেকটু সময় ঘুমিয়ে থাকত। আর রাত হলে মনে হয় ভোরের আলো ফুটলেই হয়তো ভালো হতো, তাদের জন্য দু'মুঠো খাবারের হয়তো ব্যবস্থা করা যেত।

পরদিন খাঁ খাঁ তীব্র রোদ্দুরের ঝিলিক চোখে পড়ামাত্র অসাড় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটল কিসিম্মার। তুচ্ছভাবে বেঁচে থাকার দোষে যেন মৃত্যুপুরীর এই বস্তিটিও তাকে বিদ্রূপ করছে। চেতনা কিছুটা ফিরে পেলে সহসা ব্যাকুল হয়ে ওঠে সে। বুকে আশা নিয়ে সাতটি দিন অনাহারে কাটিয়ে অবশেষে তার অপেক্ষার প্রহর বুঝি শেষ হলো। শরণার্থী তালিকায় তার নামটি যোগ করার মোক্ষম সুযোগ সপ্তাহে একদিনই আসে। তাই সুযোগ যাতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য জাতিসংঘের ত্রাণবাহী গাড়িটির সন্ধান অব্যাহত থাকে। ত্রাণ পেয়ে ৫ বছরের লাদানের মুখে পাঁচ দিন পর ক্যাকটাসের ফুল বাদে আসল আহার তুলে দিতে পারবে ভেবে হতাশার ঘোর আঁধার একটু কমে গেল। ঘণ্টা দুই এক খোঁজাখুঁজির পর বুঝতে পারল ভাগ্যের লটারিতে আবারও সে পরাজিত। ত্রাণবাহী গাড়িটি এক সপ্তাহ পর আজ এসেছিল আর তার ঘুম ভাঙ্গার আগেই চলে গিয়েছে। হঠাৎ লাদানের চিন্তা এক রকম তাকে রাগিয়েই দিল। প্রত্যেকদিন ছেলেটার ক্ষুধার যাতনা ক্রন্দনে ঘুম থেকে জেগে ওঠা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তবে আজই কেন তাকে নিশ্চুপ হয়ে থাকতে হবে? আকস্মিকভাবে ছেলের কথা মনে পড়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠল, বেঁচে আছে তো তার নয়নমণি? জীর্ণ ছেলেটি নীরবে শুয়ে আছে, প্রত্যেকটি হাড্ডি গোনা যাচ্ছে। অনেক কষ্টে লাদানের বুক ওঠানামা করছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে কোলে নিয়ে হাটা শুরু করল কিসিম্মা। আজকে যে করেই হোক খাবার সংগ্রহ করতে হবে তাকে।

চিন্তাশীল মন হয়তো ধরে নিতে পারে এটি গুটিকতক দুর্ভাগা জীবের নিছক ভাববিলাস। কিন্তু আসলেই কি তাই? বর্তমান বিশ্ব কি তাই জানান দিচ্ছে আমাদের? শুধুমাত্র আফ্রিকাতে বাস করা ২৮২ মিলিয়ন মানুষের নিত্যদিন এভাবেই কাটে-চরম ক্ষুধাকে সঙ্গ করে প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে। কস্মিনকালেও একবার পেট ভরে খেয়েছে কি না এই প্রশ্নের জবাব তাদের অজ্ঞাত, এই পরিস্থিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে লাদানের মতো ছোট শিশুরা আর কিসিম্মার মতো গর্ভবর্তী নারীরা। অল্প বয়সে ২০১১ সালে মোট শিশু মৃত্যুর ৪৫ শতাংশের (৩.১ মিলিয়ন) কারণ নিত্যদিনের খাবারের চাহিদা না মেটা। আর অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা অন্যদের চেয়ে সহজে খাবার কখনও খাওয়াই হয় না।

যদি আমরা সারা বিশ্বে অপচয় হওয়া খাবারের শুধু অর্ধেক অংশ নষ্ট না করতাম, তাহলে খুব সহজেই আমরা বিশ্ব থেকে ক্ষুধা মেটাতে সক্ষম হতাম। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে আমাদের পৃথিবীর জনসংখ্যায় আরও ২ বিলিয়ন মানুষ যুক্ত হতে যাচ্ছে এবং তাদের খাওয়াতে আমাদের মোট খাদ্য উৎপাদনের আরও ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু আমরা চাইলেই তাদের ভবিষ্যতের খাদ্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম হব শুধুমাত্র বর্তমানে আমাদের খাবারগুলোকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে না ফেলে।

এইদিকে জ্ঞান ফেরার পর বিল্ডিংটার কাছেই হতাশভাবে কাঁদছিল কিসিম্মা। ঠিক তখনই কিছু হাড্ডিসার কুকুর দৌড়ে তার পাশ দিয়ে ছুটে গেল। অবাক চোখে তাকাল সে। পাশেই ছোট্ট একটা জায়গায় জড়ো হয়ে থাকা স্তূপের মধ্যে কীসের জন্য মারামারি করছে। ঠিক কয়েক মুহূর্ত পরেই মুখে খাবার নিয়ে পালিয়ে গেল কুকুরগুলো, কেউ টের পাবার আগেই। সাথে সাথে মাথায় বুদ্ধি আসলো। এ পরের বার কুকুরগুলো আসার আগেই ওই স্তুপ থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হবে তাকে। ওই রাস্তার কোণে লুকিয়ে বসে থাকল সে, সুযোগ বুঝে লুফে নেওয়ার আশায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে সূর্য ক্রমেই পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ছে, বেশি দেরি হলে রাতের আঁধারে পথ ভুলে আটকা পড়ে যাবে, লাদান অসুস্থ অবস্থায় একা ঠান্ডা সামলাতে পারবে না। সাথে সাথে চিন্তার জালে ছেদ পড়ল, আরেকটা ময়লার বোঝা নিয়ে ট্রাক এগিয়ে আসছে। কুকুরগুলো এখনো গন্ধ পায়নি, দৌড়ে আগানো শুরু করল, গর্ভবতী হওয়ায় দৌড়াতে কষ্ট হচ্ছে, তাতে কী? স্তুপের মাঝে ডুব দিল সে, খাবার যোগ্য যে কোন কিছুর আশায়। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা বস্তু পেল, সেটা সে আগে দেখেনি, কিন্তু মাছি দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই খাবার যোগ্য। দেরি না করেই পলিথিনে মুড়ে নিল, অন্য মানুষ বা কুকুর দেখলে রক্ষা নেই।

আজ তার মুখে বিজয়ীর হাসি. সমগ্র বিশ্ব তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেও সে খাদ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। আরও একটি সপ্তাহ বেঁচে থাকবে নিশ্চয়, তবে গোধূলির লালিমা আবারো তাকে যেন ব্যাঙ্গ করল; ফেরা অসম্ভব। তার হাতে বহুল আকাঙ্ক্ষিত একটুখানি খাবার; অন্যদিকে কয়েক ক্রোশ দূরে বস্তির বিভীষিকাময় হিমশীতল পরিবেশে লাদান অনিশ্চয়তার প্রহর গুণছে। ভাগ্যের লটারি এবার কি তার পক্ষে আসবে? দারিদ্র্যতার দুষ্ট চক্র এভাবেই তার জীবনে অদৃষ্টের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জীবনের পথকে বন্ধুর করে তোলে। ওদের কাছে এর নামই বেঁচে থাকা।

হাজারো কিসিম্মা-লাদানের মানবেতর দিনযাপন, জবরজ্বালা দিনকে দিন দ্বিগুণ হওয়ার পেছনে দায়ী কী? ভৌগোলিক অবস্থা, রুক্ষ পরিগম, গৃহযুদ্ধ, উপনেবিশিক শাসন? আংশিকভাবে আমরাও কিন্তু এর জন্য দোষী। আমরা ভুলেই যাই One man's trash is another's treasure. রেস্টুরেন্টের টেবিলে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খাওয়ার সময় আধুনিকতার নামে প্লেটের অর্ধেক খাবারটা নষ্ট না করলে হয়তো জঠরাগ্রিতে দগ্ধ অনাকাঙ্ক্ষিত এ মৃত্যুগুলোর দায়ভার আমাদের কাছে আসতো না। আমরা খাবার অপচয় না করলে হয়তোবা এখনই সোমালিয়ার সে শিশুর মুখে খাবার পৌঁছে যাবে না, তবে আমাদের শহরের গলির হাড্ডিসার বৃদ্ধ ভিক্ষুকটি হয়তো খেতে পারবে।

"There is enough for everyone's need,
But not for everyone's greed."

— Mahatma Gandhi

হায়রে মানুষ!

Return to Home