শান্তিসংকট

Shantisonkot

বিশ্বসংসারে মানুষের শান্তি অন্বেষণের মহান যাত্রায় সভ্যতার অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ফ্যাসিবাদসহ বিভিন্ন মতাদর্শের চর্চা হয়েছে বিশ্বমাঝে। শান্তি প্রতিষ্ঠার আশায় প্রত্যেকের দরজায় কড়া নেড়েও স্থায়ী ইতিবাচক সাড়া মেলেনি কখনো। বরং প্রতিবার মতাদর্শের ক্রমাগত পরিবর্তন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়ে প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রদান করেছে কিছু লোমহর্ষক আখ্যান।

সভ্যতা এক চিরন্তন নিয়ম মেনে চলে। অপেক্ষাকৃত কোন উন্নত সভ্যতার সংস্পর্শে এলেই সে তার নিকট আত্মসমর্পন করে। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দেয় তার মাঝে। সভ্যতার উন্নতি-অবনতি সবকিছুই নির্ভর করে মানুষের কর্মকাণ্ডের ওপর। কারণ, সভ্যতার ধারক-বাহক এবং চালকের ভূমিকা পালিত হয় মানব সন্তানদের দ্বারাই।

❦ ❦ ❦

"Survival of the Filtest" ডারউইনের এই মতবাদের প্রয়োগ জীববিজ্ঞানের একটি বিতর্কিত বিষয় হলেও মানুষের বাস্তবজীবনে এর সঠিক সম্বোধন হয়েছে। "Might is Right" বা জোর যার মুলুক তার। অর্থাৎ পৃথিবীতে টিকে থাকার অধিকার একমাত্র যোগ্যতম এবং শক্তি ধরেরই আছে। আর এই মতবাদের চর্চা হয়ে আসছে সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই। একারণেই সচলরা দুর্বলদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সর্বদা প্রমাণ করে এসেছে। বিশ্বমাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্বটি আসলে তাদের কাঁধে। আর তুলনামূলক হীন-অসহায় প্রকৃতির মানুষেরা উপায়ন্তর না খুঁজে পেয়ে বিজয়ীদের প্রদত্ত সকল সংজ্ঞা আত্মস্থ করে নিয়েছে সবসময়।

নিষ্ঠুরতা এবং অবর্ণনীয় পাশবিকতায় নির্যাতন চালানো হয়েছে। ইতিহাসের বর্ণনাগুলোতেও এরই সন্ধান মেলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৪ সালে স্পার্টা তথা গ্রিক সামরিক শাসিত নগরবাসী এথেন্স দখল করে নেয়। বিজয়ী বাহিনী এথেন্সকে শাসন করার জন্য গঠন করে ত্রিশ সদস্যের একটি কমিশন। ইতিহাসের পাতায় আজও এই "Thirty Tyrant” এর কথা উলিখিত আছে উৎপীড়ক এবং স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীর বাস্তব উদাহারণ হিসেবে। এভাবে সেই আদিকাল থেকেই শক্তিশালী সংখ্যালঘুরা তাদের স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠত্বের জের ধরে নিজেদের স্বার্থরক্ষা, ক্ষমতা অর্জন এবং খেয়াল-খুশি বাস্তব সমস্ত ন্যায়-অন্যায়ের বাঁধ উপেক্ষা করে আসছে।

"Morality is Only the Self Interest of The Stronger" — গ্রিক দার্শনিক প্লেটো

অপরের ওপর নিজের এই শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাই মানুষকে অহংকার এবং দাম্ভিকতায় ডুবিয়ে অন্ধ করে রাখে। যুগে যুগে এই ধরনের অহকারী, গর্বিত এবং দাম্ভিক গোষ্ঠীর দ্বারাই পৃথিবীতে চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয়েছে অগনিতবার। মানুষে-মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ভেদাভেদ বেড়েছে। একে অপরে মেতেছে ধ্বংসের নেশায়। ফলে, সভ্যতা সমাজ অনৈক্যের কারণে নিজ থেকেই ভেঙ্গে পড়েছে প্রতিবার। এভাবেই পৃথিবীতে সভ্যতার পর সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মে রক্তপাত নিষিদ্ধ। একারণে অপরাধীদের হাত-পা বেঁধে নিক্ষেপ করা হতো ফুটন্ত তেলের মধ্যে। এভাবে মুহূর্তেই অপরাধীর শরীর প্রচণ্ড উত্তাপে পরিণত হতো মাংস চর্বিহীন হাড়-হাড্ডিতে। জন উইলিয়াম ড্রেপারের মতে মধ্যযুগের এই সময়কালটুকুতেই ইনকুইজিশন অভিযানে প্রায় ৩২ হাজার মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হিসেবে মানুষকে শাস্তি দেওয়ার নতুন নতুন সব কৌশলের প্রচলন ঘটে এই মধ্যযুগেই। যার মধ্যে Iron Maiden, Heretics Fork, Spanish Boot সহ আরও ভয়ানক সব শাস্তিযন্ত্র।

উপনিবেশ এর কল্যাণে ইউরোপের অবস্থা তখন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এরপর এই উপনিবেশকরাই পৃথিবীকে বিভক্ত করলো নিজ স্বার্থ অনুযায়ী। এক অভিজাত শাসক শ্রেণি এবং দুই শোষিত সাধারণ জনগণ। এর সাথে সাথে দাসত্বের শিকলে আবদ্ধ করলো আফ্রিকান নিগ্রো এবং আমেরিকার স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানদের। ব্রিটিশরা টয়লেটের দেয়ালে লিখে রাখত "For Dogs and Black Only"। কালো বর্ণের মানুষকে কুকুরের সাথে তুলনা করতেও বিবেকে এতটুকু বাঁধেনি তাদের।

আমাদের আধুনিক এই সভ্যতা মাত্র অর্ধ-শতাব্দীর ব্যবধানে উপহার দিয়েছে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ যার মধ্যে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই প্রাণ হারিয়েছে ৬ কোটি নিরপরাধ মানুষ। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে প্রাণ হারালো মাত্র ১৩-২২ লক্ষ মানুষ। তেজস্ক্রীয়তার স্বীকার হয়ে চিরতরে পঙ্গু এবং আধমরায় পরিণত হলো আরো ১৭ লক্ষ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে কোরিয়ান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কম্বোডিয়ান যুদ্ধ, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ সহ সব মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ।

উপসংহার

শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাই ব্যর্থতা স্বীকার করে বিশ্ববাসী আজ দিশেহারা। সভ্যতার ঠিকানা খোঁজার আলাপটা ঠিক এখানেই খুব বেশি প্রাসঙ্গিক অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যার জন্য প্রয়োজন শুধু এক চিলতে হাসি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার। আর এভাবেই নিজ স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার সাহস এবং অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার মনোভাবই পারবে সুন্দর একটি পৃথিবীর জন্ম দিতে যেখানে 'যুদ্ধ-সংঘাত' শব্দ দুটিকে চিরতরে অভিধান থেকে মুছে ফেলার প্রয়োজন হবে আমাদের।